বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কার্যালয় | ছবি: প্রথম আলো
Originally posted in ProthomAlo on 25 January 2026
সরকারি যেকোনো পরিসংখ্যানের প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য এখন থেকে পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে ছুটতে হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক নিজেই তা প্রকাশ করতে পারবেন।
এতে পরিসংখ্যান নিয়ে কারসাজির পথ বন্ধ হবে বলে আশা করছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তবে বিবিএস স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘পরিসংখ্যান প্রণয়ন, প্রকাশ ও সংরক্ষণ’ নীতিমালা জারি করে। নীতিমালা অনুসরণে একটি বিধিমালা তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্বের অবশিষ্ট সময়ে বিধিমালাটি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন দিতে চায়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশে সময় কমে আসবে বলে মনে করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এতে সময় কম লাগবে। সঠিক ও নির্ভুল তথ্য উঠে আসবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও থাকবে না।
এ–সংক্রান্ত বিধিমালা শিগগিরই অনুমোদন করা হবে বলে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সব সময় পরিসংখ্যানের কারসাজির অভিযোগ থাকে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য বাড়িয়ে দেখানো ও মূল্যস্ফীতির তথ্য কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা থাকে তাদের মধ্যে।
মন্ত্রীর কাছে জরিপ ও শুমারির প্রতিবেদন পাঠাতে না হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমে আসবে বলে মনে করেন তাঁরা। তাহলে জরিপ ও শুমারির সঠিক তথ্যটা মানুষ জানতে পারবে।
![]()
বিবিএস পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইন অনুযায়ী সংস্থাটির দায়িত্ব হচ্ছে জনশুমারি, কৃষিশুমারি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ শুমারিসহ অন্যান্য জরিপ ও শুমারির কার্যক্রম গ্রহণ করা। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ভোক্তার মূল্যসূচকসহ অন্যান্য সূচকের তথ্য প্রকাশ করাও সংস্থাটির দায়িত্ব। বিবিএসে মহাপরিচালক বা ডিজি নিয়োগ দেয় সরকার, যিনি অতিরিক্ত সচিবের পদমর্যাদার।
এত দিন সংস্থাটির যেকোনো জরিপ ও শুমারির পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়ার রীতি ছিল। নতুন নীতিমালায় সে রীতি আর থাকছে না। এখন থেকে মূল্যস্ফীতি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক শুমারি, শ্রমশক্তি জরিপের পরিসংখ্যান বিবিএস মহাপরিচালক প্রকাশ করতে পারবেন। এতে পরিকল্পনামন্ত্রীর ক্ষমতা কমল।
বিবিএসে এখন ছয়টি শাখা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, কৃষি, জনশুমারি, জনসংখ্যাতত্ত্ব ও স্বাস্থ্য, শিল্প, জাতীয় আয়-ব্যয় এবং কম্পিউটার শাখা। এসব শাখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জরিপ ও শুমারি হয়ে থাকে।
নীতিমালায় বলা হয়, বিবিএস সঠিক, নির্ভুল ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যান তৈরি, প্রকাশ এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ‘শাখাভিত্তিক কারিগরি পরামর্শ কমিটি’ গঠন করবে।
কৃষিভিত্তিক কোনো জরিপ বা শুমারি করলে বিবিএস ১৪ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করবে, যে কমিটির প্রধান থাকবেন সংস্থার মহাপরিচালক। এ কমিটিতে সরকারের অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের প্রতিনিধি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
![]()
কৃষিসংক্রান্ত যেকোনো ফসল উৎপাদনের হিসাব, জরিপ ও শুমারির পরিসংখ্যান যাচাই–বাছাই করে এ কমিটির মাধ্যমে বিবিএসের ডিজি পরিসংখ্যান প্রকাশ করবেন। তবে তা অবশ্যই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী। এসব পরিসংখ্যানের প্রতিবেদন প্রকাশের আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে না।
বিবিএসের পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সব সময়ই প্রশ্ন ছিল। অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ, সব সরকার রাজনৈতিক সুবিধা নিতে নিজেদের মতো পরিসংখ্যান দেখায়। যেমন প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো, প্রকৃত (উচ্চ) মূল্যস্ফীতি লুকানো।
পরিসংখ্যান কারসাজির অভিযোগ বহুদিনের। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি ব্যাপকতা পেয়েছিল। তখন মন্ত্রীরাই পরিসংখ্যান নিয়ে সবচেয়ে বেশি কারসাজি করেছেন বলে অভিযোগ অর্থনীতিবিদদের।
![]()
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে (২০১৪-২০১৮) বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে সবচেয়ে বেশি কারসাজির অভিযোগ ছিল। বলা হয়, বিবিএসের কর্মকর্তারা জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব নিয়ে মুস্তফা কামালের কাছে গেলে তিনি প্রবৃদ্ধির অঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিতে বলতেন।
বিবিএস সাধারণত প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করত। কিন্তু ২০১৭ সালে হঠাৎ মূল্যস্ফীতির তথ্য তিন মাস পরপর প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এর কারণ, তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। পরে মূল্যস্ফীতি কমে এলে আবার প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের ধারা শুরু করা হয়।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে তো মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সবুজসংকেত লাগত। একনেক সভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে দেখিয়ে তবেই মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করা হতো। এ ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিবিএসের তথ্যের ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়।
![]()
নীতিমালায় বলা হয়, জনশুমারি করার সময় ১৩ সদস্যের একটি কারিগরি পরামর্শ কমিটি গঠন করবে বিবিএস, যার সভাপতি থাকবেন সংস্থাটির ডিজি। এ কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের প্রতিনিধি, পরিসংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি, আইসিডিডিআরবির প্রতিনিধি, পপুলেশন কাউন্সিলের প্রতিনিধি, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) প্রতিনিধি থাকবেন। জনসংখ্যাসংক্রান্ত কোনো জরিপ বা শুমারি করার এ কমিটি তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ ও পরামর্শ দেবে, ডিজি প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন।
এমনিভাবে জনসংখ্যাতত্ত্ব ও স্বাস্থ্য শাখার জন্য ১৩ সদস্যের কারিগরি কমিটি, শিল্প এবং শ্রম শাখার জন্য ১৪ সদস্য, জাতীয় আয়–ব্যয় শাখায় ১৭ সদস্য এবং কম্পিউটার শাখার ১৬ সদস্যের কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পরিসংখ্যানসংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন মন্ত্রীর কাছে গেলে সময় লাগে বেশি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তে হয়। এতে জরিপ ও শুমারির ফল প্রকাশে দেরি হয়। আবার ফলাফল নিজেদের অনুকূলে না গেলে মন্ত্রী তা পছন্দ করেন না। তখন আবার কারসাজির কথাও ওঠে।
মঈনুল ইসলাম বলেন, এখন থেকে যদি জরিপ ও শুমারির ফল পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে না যায়, ফলাফলে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। সময়ও কম লাগবে। জরিপের বস্তুনিষ্ঠতা উঠে আসবে।
তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, নীতিমালায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকার কথা কাগজে–কলমে না থাকলেও ভেতরে কী হচ্ছে, তা জানা যাবে না। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত বিবিএসকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা থেকেই যাবে।